শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫, ০৮:৪২ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক: টানা নয় দিন সরকারি ছুটিতে এবার ঈদে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে উপচেপড়া ভিড় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেট ও পার্বত্য এলাকায় পর্যটকের ঢল নামতে পারে। সেই সঙ্গে বেশি জনসমাগমের কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। এ আশঙ্কা থেকে এবার ঈদের লম্বা ছুটিতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পর্যটনকেন্দ্রগুলো চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা ও ইভটিজিংয়ের মতো ঘটনা প্রতিরোধে টহল মোবাইল টিম মোতায়েনের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সারা দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ট্যুরিস্ট পুলিশ ও থানা পুলিশের সমন্বয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ সূত্র বলছে, যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি প্রতিরোধে ৩ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
যেসব স্পটে জনসমাগম বেশি হয় সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। অতি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছাড়া ট্যুরিস্ট পুলিশের তেমন কোনো সদস্যকে ঈদের ছুটিও দেওয়া হয়নি। যদিও ট্যুরিস্ট পুলিশের জনবল ও সরঞ্জাম সংকট ও বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে অপরাধ কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা হুমকি উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা। কক্সবাজারে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অতিরিক্ত ৫০ জন ফোর্স নেওয়া হয়েছে। কুয়াকাটা, পার্বত্য অঞ্চল ও সুন্দরবনেও বাড়তি ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৩০টির মতো পর্যটন স্পটে জনসমাগম হয় সবচেয়ে বেশি। এগুলোতে কার্যকর নজরদারি থাকলে এবং পর্যটকরা আরও সচেতন হলে নিরাপত্তা ঝুঁকি কমে যাবে।
ট্যুরিস্ট পুলিশপ্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাইনুল হাসান বলেন, এবার লম্বা ছুটিতে বেশ কয়েকটি পর্যটন স্পটে জনসমাগম বাড়তে পারে বলে আমরা আশা করছি। জনসমাগম বেশি হলে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ যেমন—ছিনতাই, প্রতারণা, ইভটিজিং, দোকানিদের কারসাজি ও চুরির মতো ঘটনা ঘটে থাকে। এ জন্য ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে কক্সবাজার, কুয়াকাটা ও পার্বত্য জেলাগুলোর পর্যটনকেন্দ্রে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অন্য পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও থানা পুলিশের সহযোগিতায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানিয়েছে, দেশে ১ হাজার ৬৭৫টি পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ৩২ জেলার ১০৪টি স্পটে পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করছেন ট্যুরিস্ট পুলিশের ১ হাজার ৩৯১ জন সদস্য। অর্থাৎ, বাকি ১ হাজার ৫৭১টি স্পটে নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এসব পর্যটন স্পট অনিরাপদ থেকে যাচ্ছে। এ চিত্র পর্যটকদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। কেননা দেশে দিন দিন পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে।
ভ্রমণ পিয়াসীরা প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দেখার জন্য দুর্গম এলাকায় যাচ্ছে। নিজেরাই এসব পর্যটনকেন্দ্র আবিষ্কার করছে। সেখানে গিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছে। ধীরে ধীরে সেসব স্থান পর্যটন স্পটে পরিণত হচ্ছে। সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে, তারা যেসব স্পটে যাচ্ছে, সেখানে যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। তার চেয়েও বড় কথা, নিরাপত্তার সংকট রয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সভাপতি আবদুস সালাম আরেফ বলেন, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিজেদের সতর্ক থাকাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি এবং প্রত্যেক পর্যটকের সতর্ক হওয়া উচিত। তা হলে নিরাপত্তা ঝুঁকি এমনিতেই অনেকটা কমে যাবে। আমরা মনে করি, পর্যটন স্পটের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি বলা হলেও বাস্তবে সারা দেশে ৩০টির মতো স্পটে জনসমাগম সবচেয়ে বেশি হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই ৩০ স্পটে বাড়তি গুরুত্ব দিলে ঝুঁকি এমনিতেই কমে যাবে। বিশেষ করে সিলেটের সাদাপাথর ও জাফলংয়ের হাউসবোর্ড এবং বিভিন্ন চা বাগানে বাড়তি নিরাপত্তা নেওয়া উচিত। কক্সবাজার ও কুয়াকাটাতেও বিশাল জনসমাগম ঘটে। এ জায়গাগুলোতে বাড়তি নজর দিতে হবে। একইসঙ্গে জনসচেতনতায় জোর দিতে হবে। তা হলেই পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যেকোনো অপরাধ রুখে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি।
দেশের ভ্রমণপ্রিয় মানুষের সবচেয়ে পছন্দের অন্যতম স্থান কক্সবাজার। তাই এবার এ সৈকত শহরে আগের বছরের চেয়েও বেশি ভিড় হবে বলে মনে করছেন পর্যটন ব্যবসায়ী ও হোটেল-মোটেলের মালিকরা। হোটেল-মোটেল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর ঈদুল ফিতরের টানা ছুটিতে ৯ লাখ ৭০ হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেছিলেন কক্সবাজারে। এবারের ঈদের ছুটির দ্বিতীয় দিন থেকে হোটেল-মোটেলগুলো বুকিং হয়েছে। ঈদের ছুটি ৫ এপ্রিল পর্যন্ত হলেও ১২ এপ্রিল পর্যন্ত টানা রুম বুকিং রয়েছে বেশির ভাগ হোটেলে। ইতিমধ্যে শহরের ৫ শতাধিক হোটেল গেস্ট হাউস, রিসোর্ট ও কটেজে ৫৫ শতাংশ রুম অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। অবশিষ্ট রুমগুলোও ৩১ মার্চের আগে বুকিং হয়ে যাবে। পাঁচ শতাধিক হোটেলের দৈনিক ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৮৭ হাজার।
এদিকে সম্প্রতি কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ছিনতাই, চুরি, অস্ত্রধারীদের দাপট, খুন ও অপহরণের পাশাপাশি হোটেল দখল, চাঁদাবাজি, হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটের মতো গুরুতর অপরাধে জনজীবন বিপর্যস্ত। শহরের অন্তত ২০টি স্পটে ছিনতাইকারী চক্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বলে জানা গেছে। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. সাইফউদ্দীন শাহীন সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের নিয়মিত ফোর্স ও লজিস্টিক পুরোটাই আমরা পর্যটকদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রাখব। এরপরও এবার লম্বা ছুটি হওয়ায় পর্যটকদের সংখ্যা বেশি হবে—এমন ধারণা এবং ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে অতিরিক্ত ৫০ জন ফোর্স আনা হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করে ইতিমধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়েছে। আশা করি, এবারের ঈদে পর্যটকদের জন্য নির্বিঘ্ন হবে।
এদিকে পাহাড়, পানি, পাথরের বিছানা কিংবা সবুজ চা বাগান, সব মিলিয়ে প্রকৃতি-কন্যা সিলেটে এবার ঈদের ছুটিতে ঢল নামতে পারে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন। ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (ঢাকা-সিলেট-ময়মনসিংহ বিভাগ) মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তা ঝুঁকির কিছু দেখছি না। এরপরও আমরা ৩ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হাতে নিয়েছি। ঈদের আগে, ঈদের দিন ও ঈদ পরবর্তী সময় ঘিরে আমাদের আলাদা পরিকল্পনা রয়েছে। টহল টিম বাড়ানোর পাশাপাশি মোবাইল টিমের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়াও পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ সদস্য সাদা পোশাকে মোতায়েন থাকবে। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। সড়কে যানজট নিরসনেও ট্যুরিস্ট পুলিশ তৎপর থাকবে।
ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা যায়, গতকাল পর্যন্ত কুয়াকাটায় প্রথম শ্রেণির হোটেলগুলোর ৫০-৬০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় শ্রেণির হোটেলগুলোর ৩০-৪০ শতাংশ রুম অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা, সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা এবং পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় স্টেক হোল্ডার, ১৬টি পেশার প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, ট্যুরিস্ট পুলিশের সমন্বয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (খুলনা-বরিশাল বিভাগ) মো. ইকবাল সময়ের আলোকে বলেন, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে কুয়াকাটা ও সুন্দরবনে বেশি পর্যটকের সমাগম হয়। এবার লম্বা ছুটি হওয়ায় জনসমাগম আরও বেশি হবে। এটিকে মাথায় রেখেই আমরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা হাতে নিয়েছি। আশা করি, পর্যটকদের জন্য নিরাপদেই কাটবে সময়।